বিশেষ ইসলামিক দিবস ও মৌসুমী আমল

আইয়ামে তাশরীক (১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজ): ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক ও জিকিরের বিধান

জিলহজ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে বলা হয় 'আইয়ামে তাশরীক' এবং পবিত্র কুরআনে একে 'আইয়ামিন মাদুদাত' বলা হয়েছে। জানুন ৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক পাঠের ওয়াজিব বিধান ও ফজিলত।

১. পটভূমি ও দ্বীনি জীবনের প্রাসঙ্গিকতা

পবিত্র কুরআনুল কারীম মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার এবং অনন্ত হেদায়েতের একমাত্র পথপ্রদর্শক। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষের অন্তরে আল্লাহর কালাম ও সুন্নাহর সঠিক বোধ জাগ্রত রাখা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। "আইয়ামে তাশরীক (১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজ): ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক ও জিকিরের বিধান" বিষয়টি কেবল একটি তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের দৈনন্দিন আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সাফল্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

২. পবিত্র কুরআনের নূরানী শিক্ষা ও দলিল

وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَّعْدُودَاتٍ
"আর তোমরা নির্ধারিত কয়েকটি দিনে (আইয়ামে তাশরীকে—১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজ) আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো।"
(সূরা আল-বাকারাহ: ২০৩)

উপরোক্ত আয়াতটির গভীরতা আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে, মানবজীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মহান রবের হুকুমের অধীন। যখন একজন মুমিন নিষ্ঠার সাথে এই নির্দেশগুলো জীবনে প্রতিফলিত করে, তখন তার চিন্তা, চরিত্র ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।

৩. প্রিয় নবী ﷺ-এর সুন্নাহ ও সহীহ হাদিস

📜 সহীহ হাদিসের অমূল্য বাণী:

"আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলো (জিলহজের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ) হলো পানাহার এবং আল্লাহর জিকির করার দিন।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৪১

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ হলো কুরআনকে বাস্তবে প্রয়োগ করার নিখুঁত চিত্র। হাদিস শরীফে বর্ণিত এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার মাধ্যমেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ মুমিন হিসেবে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে।

স্পন্সরড বিজ্ঞাপন / Sponsored Content

৪. মূল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ও শিক্ষা

আইয়ামে তাশরীক ও তাকবীরে তাশরীক: জিকিরে মুখরিত নির্ধারিত দিনসমূহ

ঈদুল আজহার পরের তিনটি দিন—অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় 'আইয়ামে তাশরীক' (أيام التشريق) বলা হয়। আর পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২০৩ নম্বর আয়াতে এই তিনটি দিনকেই 'আইয়ামিন মাদুদাত' (নির্ধারিত বা গণনাকৃত দিনসমূহ) বলে অভিহিত করা হয়েছে।

১. আল্লাহর কাছে ২য় ও ৩য় শ্রেষ্ঠ দিন! সুনানে আবু দাউদের (১৭৬৫) এক সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: > **"আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট দিনসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো ইয়াওমুন নাহর (১০ই জিলহজ কুরবানির দিন), এবং এরপর শ্রেষ্ঠ দিন হলো ইয়াওমুল কার্র (১১ই জিলহজ—মিনায় অবস্থানের দিন)!"**

২. তাকবীরে তাশরীকের পূর্ণাঙ্গ মাসআলা ও বিধান - **সময়কাল**: ৯ই জিলহজ ফজরের ফরজ নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ই জিলহজ আসরের ফরজ নামাজ পর্যন্ত—মোট **২৩ ওয়াক্ত**। - **শব্দসমূহ**: > **اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، وَلِلَّهِ الْحَمْدُ** > **উচ্চারণ**: *আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।* - **কার ওপর ওয়াজিব**: মুকিম বা মুসাফির, গ্রামবাসী বা শহরবাসী, জামাতে নামাজ আদায়কারী বা একাকী আদায়কারী—প্রত্যেক পুরুষ ও নারীর ওপর ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর সাথে সাথে একবার পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষরা সশব্দে (উচ্চস্বরে) এবং নারীরা নীরবে (নিজের কান শোনে এমন স্বরে) পাঠ করবেন। - **ভুলে গেলে করণীয়**: সালাম ফেরানোর পর যদি কেউ তাকবীর বলতে ভুলে যান, তবে কথা বলা বা মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে মনে পড়লে সাথে সাথে বলে নেবেন।

৩. আইয়ামে তাশরীকে বিশেষ কুরআনিক দোয়া সূরা আল-বাকারার ২০০–২০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা হজ ও আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক ব্যাপক অর্থবোধক দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন: > **رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ** > **উচ্চারণ**: *রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার।* > **অর্থ**: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।

📋 আমলের ব্যবহারিক চেকলিস্ট:

  1. ৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর সাথে সাথে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা।
  2. পুরুষরা মধ্যম/উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচু স্বরে প্রতি ফরজ নামাজের পর কমপক্ষে একবার (উত্তম হলো তিনবার) তাকবীরে তাশরীক পড়া।
  3. ১০, ১১, ১২ ও ১৩ই জিলহজ—এই চার দিন রোজা রাখা থেকে বিরত থাকা, কারণ এ দিনগুলো আল্লাহর মেহমানদারি ও জিকিরের দিন।
  4. কুরবানির দিন (১০ই জিলহজ) কুরবানি করতে না পারলে ১১ বা ১২ই জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্বে কুরবানি সম্পন্ন করা।

৫. এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মের সুবিধা

আপনার এই আমলকে সহজ ও নিয়মিত করতে এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ফিচারসমূহ। ইসলামিক ক্যালেন্ডার, বিশেষ দিবসের মাসনূন আমল ও সহীহ দোয়া সংকলন সহ আপনি পাচ্ছেন ১১৪টি সূরার শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, অডিও এবং বিষয়ভিত্তিক সার্চ সুবিধা।

👉 বিশেষ সুবিধা: আজকের নামাজ ও সেহরি-ইফতারের সময়সূচি দেখুন →

মোবাইলে বিজ্ঞাপনমুক্ত কুরআন পাঠ ও আমল করুন

১১৪টি সূরার বিশুদ্ধ বাংলা অর্থ, সুললিত অডিও তিলাওয়াত, নামাজের সঠিক সময়সূচী, কিবলা কম্পাস ও ডিজিটাল তাসবিহ সহ সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাপ ডাউনলোড করুন।

Google Play থেকে ইনস্টল করুন ➜

প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন: তাকবীরে তাশরীক কখন থেকে কখন পর্যন্ত পড়া ওয়াজিব?
উত্তর: হযরত আলী (রা.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আমলের আলোকে ৯ই জিলহজ (আরাফার দিন) ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ই জিলহজ আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ৫ দিনে ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পরপরই প্রত্যেক বালেগ নারী-পুরুষের ওপর (জামাতে হোক বা একাকী) একবার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব।
প্রশ্ন: তাকবীরে তাশরীকের পূর্ণ আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ কী?
উত্তর: আরবি: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، وَلِلَّهِ الْحَمْدُ। বাংলা উচ্চারণ: 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।' অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান; আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই জন্য।
প্রশ্ন: কুরবানি করার সময় কয় দিন পর্যন্ত থাকে?
উত্তর: ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট ৩ দিন কুরবানি করা যায় (শাফেয়ী মাযহাবে ও কোনো কোনো হাদিস অনুযায়ী ১৩ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত ৪ দিন)। তবে ১০ই জিলহজ ঈদের দিন কুরবানি করাই সর্বোত্তম।
← পূর্ববর্তী আর্টিকেল পরবর্তী আর্টিকেল →

সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল