বিশেষ ইসলামিক দিবস ও মৌসুমী আমল
সেহরি ও ইফতারের সুন্নত নিয়ম, বরকত ও ইফতারের মুহূর্তে দোয়া কবুলের গোপন রহস্য
✍️ GSEN IT ইসলামিক রিসার্চ টিম
🗓️ ২০২৬-১০-১৬
⏱️ ৭ মিনিট পাঠ
👁️ 4,910 বার পঠিত
সেহরি খাওয়ার মাঝে রয়েছে বিশেষ বরকত এবং ইফতারের মুহূর্তটি হলো দোয়া কবুলের সুবর্ণ সময়। জানুন সেহরি ও ইফতারের সহীহ সুন্নত নিয়ম, মাসনূন দোয়া (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ) এবং অন্যকে ইফতার করানোর অসীম সওয়াব।
১. পটভূমি ও দ্বীনি জীবনের প্রাসঙ্গিকতা
পবিত্র কুরআনুল কারীম মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার এবং অনন্ত হেদায়েতের একমাত্র পথপ্রদর্শক। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষের অন্তরে আল্লাহর কালাম ও সুন্নাহর সঠিক বোধ জাগ্রত রাখা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। "সেহরি ও ইফতারের সুন্নত নিয়ম, বরকত ও ইফতারের মুহূর্তে দোয়া কবুলের গোপন রহস্য" বিষয়টি কেবল একটি তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের দৈনন্দিন আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সাফল্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
২. পবিত্র কুরআনের নূরানী শিক্ষা ও দলিল
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ۖ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
"আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা রাতের কালো রেখা থেকে তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো।"
(সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৭)
উপরোক্ত আয়াতটির গভীরতা আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে, মানবজীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মহান রবের হুকুমের অধীন। যখন একজন মুমিন নিষ্ঠার সাথে এই নির্দেশগুলো জীবনে প্রতিফলিত করে, তখন তার চিন্তা, চরিত্র ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।
৩. প্রিয় নবী ﷺ-এর সুন্নাহ ও সহীহ হাদিস
📜 সহীহ হাদিসের অমূল্য বাণী:
"তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরির খাদ্যের মধ্যে বরকত রয়েছে। আর মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে অবিলম্বে ইফতার করবে।"
— সহীহ বুখারী: ১৯২৩, ১৯৫৭; সহীহ মুসলিম: ১০৯৫, ১০৯৮
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ হলো কুরআনকে বাস্তবে প্রয়োগ করার নিখুঁত চিত্র। হাদিস শরীফে বর্ণিত এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার মাধ্যমেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ মুমিন হিসেবে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে।
স্পন্সরড বিজ্ঞাপন / Sponsored Content
৪. মূল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ও শিক্ষা
সেহরি ও ইফতার: সুন্নাহর অনুসরণ ও দোয়া কবুলের মাহেন্দ্রক্ষণ
মাহে রমজানের প্রতিদিন শুরু হয় ভোররাতের বরকতময় সেহরি দিয়ে এবং সমাপ্ত হয় গোধূলিবেলার আনন্দময় ইফতার দিয়ে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেহরি ও ইফতারের প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়ের জন্য উম্মতকে সুস্পষ্ট সুন্নাহ শিখিয়ে গেছেন।
১. সেহরির বরকত ও সুন্নতসমূহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: *"আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান) এবং আমাদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সেহরি খাওয়া।"* (সহীহ মুসলিম: ১০৯৬)। অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন: *"সেহরি খাওয়া পুরোটাই বরকত, তাই তোমরা তা ত্যাগ করো না, যদিও এক ঢোক পানি পান করেও হয়। কেননা যারা সেহরি খায়, আল্লাহ তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করেন।"* (মুসনাদে আহমাদ: ১১০৮৬)
- **দেরিতে সেহরি খাওয়া সুন্নত**: মধ্যরাতে খেয়ে ঘুমিয়ে না পড়ে সুবহে সাদিকের (ফজরের ওয়াক্ত শুরুর) কাছাকাছি সময়ে সেহরি খাওয়া সুন্নত। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ-এর সাথে আমাদের সেহরি খাওয়া এবং ফজরের নামাজে দাঁড়ানোর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র পঞ্চাশটি আয়াত তিলাওয়াত করার সমপরিমাণ সময় (প্রায় ১৫-২০ মিনিট) (সহীহ বুখারী: ১৯২১)।
- **মুমিনের উত্তম সেহরি খেজুর**: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: *"মুমিনের কতই না উত্তম সেহরি হলো খেজুর!"* (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৪৫)।
২. ইফতারের সুন্নত নিয়ম ও সহীহ দোয়া
- **দ্রুত ইফতার করা (তা'জীলুল ইফতার)**: সূর্য ডুবে যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে দেরি না করে ইফতার করা সুন্নত।
- **খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার**: আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মাগরিবের নামাজ পড়ার পূর্বে কয়েকটি তাজা খেজুর (রুতাব) দিয়ে ইফতার করতেন; তাজা খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুর (তুমুর) দিয়ে, আর তাও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬)।
- **ইফতারের মাসনূন দোয়া**:
**বিসমিল্লাহ** বলে খেজুর বা পানি মুখে দেওয়ার পর পাঠ করবেন:
> **ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ**
> **উচ্চারণ**: *যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।*
> **অর্থ**: পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব নির্ধারিত হয়ে গেল। (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৭ — হাসান সহীহ)
প্রচলিত অপর দোয়াটিও পাঠ করা যায়:
> اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
> উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু।
> অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছি এবং আপনার প্রদত্ত রিযিক দ্বারাই ইফতার করছি। (আবু দাউদ: ২৩৫৮)
৩. ইফতারের পূর্ব মুহূর্ত: দোয়া কবুলের গ্যারান্টিযুক্ত সময়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: *"তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: ১. রোজাদারের দোয়া ইফতার করার সময় পর্যন্ত, ২. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং ৩. মজলুমের দোয়া।"* (সুনানে তিরমিযী: ৩৫৯৮)। তাই ইফতারের আগের ১৫ মিনিট রান্নাঘরে বা গল্পগুজবে ব্যয় না করে জায়নামাজে বসে দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে জান্নাত ও মাগফিরাত প্রার্থনা করুন।
📋 আমলের ব্যবহারিক চেকলিস্ট:
- শেষ সময়ে সেহরি খাওয়া (ফজরের ওয়াক্ত শুরুর কিছুক্ষণ আগে শেষ করা) এবং অন্তত এক ঢোক পানি বা একটি খেজুর হলেও গ্রহণ করা।
- সেহরি খাওয়ার পর ফজরের আজানের মধ্যবর্তী সময়ে ইস্তিগফার ও তাহাজ্জুদের দোয়া করা।
- সূর্যাস্তের সাথে সাথে দেরি না করে তাজা বা শুকনো খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা।
- ইফতার সামনে নিয়ে আড্ডায় মশগুল না হয়ে মাগরিবের পূর্বের সোনালী ১০-১৫ মিনিট একান্ত মনে দোয়া করা।
৫. এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মের সুবিধা
আপনার এই আমলকে সহজ ও নিয়মিত করতে এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ফিচারসমূহ। ইসলামিক ক্যালেন্ডার, বিশেষ দিবসের মাসনূন আমল ও সহীহ দোয়া সংকলন সহ আপনি পাচ্ছেন ১১৪টি সূরার শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, অডিও এবং বিষয়ভিত্তিক সার্চ সুবিধা।
👉 বিশেষ সুবিধা: আজকের নামাজ ও সেহরি-ইফতারের সময়সূচি দেখুন →
মোবাইলে বিজ্ঞাপনমুক্ত কুরআন পাঠ ও আমল করুন
১১৪টি সূরার বিশুদ্ধ বাংলা অর্থ, সুললিত অডিও তিলাওয়াত, নামাজের সঠিক সময়সূচী, কিবলা কম্পাস ও ডিজিটাল তাসবিহ সহ সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
Google Play থেকে ইনস্টল করুন
➜
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: সেহরি খাওয়ার সময় রোজার নিয়ত কীভাবে করতে হয়?
উত্তর: নিয়ত হলো অন্তরের সংকল্প। রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে সেহরি খাওয়াটাই রোজার নিয়ত। এর জন্য আলাদা কোনো আরবি বাক্য ('নাওয়াইতু আন আসুমা...') মুখে উচ্চারণ করা হাদিসে বর্ণিত নেই; মনে মনে আগামীকাল রোজা রাখার ইচ্ছা থাকলেই রোজা সহীহ হয়ে যায়।
প্রশ্ন: ইফতার করার সহীহ সুন্নত দোয়া কোনটি?
উত্তর: 'বিসমিল্লাহ' বলে ইফতার শুরু করবে এবং ইফতার করার পর সুনানে আবু দাউদে (২৩৫৭) বর্ণিত সহীহ দোয়াটি পাঠ করবে: 'যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ' (পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব নির্ধারিত হলো)। এছাড়া 'আল্লাহুম্মা ইন্নী লাকা সুমতু...' দোয়াটিও পাঠ করা যায়।
প্রশ্ন: কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে কী সওয়াব পাওয়া যায়?
উত্তর: সুনানে তিরমিযীর সহীহ হাদিসে (৮০৭) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে; অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।'
সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল