বিশেষ ইসলামিক দিবস ও মৌসুমী আমল
পবিত্র আশুরা (১০ই মহররম): মূসা (আ.)-এর বিজয়, আশুরার ২টি রোজার ফজিলত ও করণীয়-বর্জনীয়
✍️ GSEN IT ইসলামিক রিসার্চ টিম
🗓️ ২০২৬-১০-১৬
⏱️ ৮ মিনিট পাঠ
👁️ 4,560 বার পঠিত
মহররম মাসের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরা। এই দিনে মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। জানুন আশুরার রোজার মাধ্যমে বিগত ১ বছরের গুনাহ মাফের ফজিলত, কেন ২টি রোজা রাখতে হয় এবং বর্জনীয় কুসংস্কারসমূহ।
১. পটভূমি ও দ্বীনি জীবনের প্রাসঙ্গিকতা
পবিত্র কুরআনুল কারীম মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার এবং অনন্ত হেদায়েতের একমাত্র পথপ্রদর্শক। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষের অন্তরে আল্লাহর কালাম ও সুন্নাহর সঠিক বোধ জাগ্রত রাখা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। "পবিত্র আশুরা (১০ই মহররম): মূসা (আ.)-এর বিজয়, আশুরার ২টি রোজার ফজিলত ও করণীয়-বর্জনীয়" বিষয়টি কেবল একটি তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের দৈনন্দিন আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সাফল্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
২. পবিত্র কুরআনের নূরানী শিক্ষা ও দলিল
وَأَنجَيْنَا مُوسَىٰ وَمَن مَّعَهُ أَجْمَعِينَ ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ
"আর আমি রক্ষা করলাম মূসা এবং তাঁর সাথে যারা ছিল তাদের সবাইকে; অতঃপর ডুবিয়ে মারলাম অপর দলটিকে (ফেরাউন ও তার বাহিনীকে)।"
(সূরা আশ-শুআরা: ৬৫-৬৬)
উপরোক্ত আয়াতটির গভীরতা আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে, মানবজীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মহান রবের হুকুমের অধীন। যখন একজন মুমিন নিষ্ঠার সাথে এই নির্দেশগুলো জীবনে প্রতিফলিত করে, তখন তার চিন্তা, চরিত্র ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।
৩. প্রিয় নবী ﷺ-এর সুন্নাহ ও সহীহ হাদিস
📜 সহীহ হাদিসের অমূল্য বাণী:
"আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এর বিনিময়ে পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন! আর আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও (৯ ও ১০ই মহররম দুটি) রোজা রাখব।"
— সহীহ মুসলিম: ১১৬২, ১১৩৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ হলো কুরআনকে বাস্তবে প্রয়োগ করার নিখুঁত চিত্র। হাদিস শরীফে বর্ণিত এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার মাধ্যমেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ মুমিন হিসেবে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে।
স্পন্সরড বিজ্ঞাপন / Sponsored Content
৪. মূল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ও শিক্ষা
পবিত্র আশুরা (১০ই মহররম): ঐতিহাসিক মুক্তি, শুকরিয়ার রোজা ও কারবালার শিক্ষা
মহররম মাসের দশম দিনটিকে বলা হয় ইয়াওমুল আশুরা (يوم عاشوراء)। ইসলামের ইতিহাসে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে আশুরার রোজা ফরজ ছিল এবং রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ হিসেবে বলবৎ থাকে।
১. মূসা (আ.)-এর অলৌকিক বিজয় ও শুকরিয়ার রোজা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন (সহীহ বুখারী: ২০০৪):
- প্রবল পরাক্রমশালী জালিম শাসক ফেরাউন যখন হযরত মূসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে হত্যা করার জন্য লোহিত সাগরের তীরে কোণঠাসা করে ফেলে, তখন আল্লাহর হুকুমে মূসা (আ.) সাগরে লাঠি আঘাত করেন।
- মুহূর্তের মধ্যে সাগরের পানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বারোটি শুষ্ক রাস্তা তৈরি হয়ে যায়! মূসা (আ.) ও ঈমানদারগণ নিরাপদে পার হয়ে যান এবং ফেরাউন ও তার বিশাল সৈন্যবাহিনী সাগরের পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়।
- এই মহাবিজয়ের দিনটি ছিল **১০ই মহররম (আশুরা)**। আল্লাহর এই অসীম অনুগ্রহের শুকরিয়া আদায় করতে হযরত মূসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন এবং আমাদের প্রিয় নবীজি ﷺ-ও এই দিনে রোজা রেখেছেন।
২. আশুরার রোজার প্রতিদান ও নবীজি ﷺ-এর বিশেষ আগ্রহ
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:
> **"আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার দিনের রোজা এবং রমজান মাসের রোজার চেয়ে অন্য কোনো রোজাকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে তালাশ করতে দেখিনি!"** (সহীহ বুখারী: ২০০৬)
আর সহীহ মুসলিমের হাদিসে (১১৬২) নবীজি ﷺ সুসংবাদ দিয়েছেন—আশুরার রোজা বিগত এক বছরের সগিরা গুনাহ সম্পূর্ণরূপে মোচন করে দেয়!
৩. কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা ও বিশুদ্ধ আকীদা
নবীজি ﷺ-এর ওফাতের ৫০ বছর পর, ৬১ হিজরির ১০ই মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে জান্নাতের যুবকদের সর্দার ও নবীজি ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র **হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রা.)** সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জালিম বাহিনীর হাতে পরিবারসহ শাহাদাত বরণ করেন।
- কারবালার ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় অন্যায়ের সামনে কখনো মাথানত না করতে।
- তবে শোক প্রকাশের নামে বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, কালো কাপড় পরা বা তাজিয়া মিছিল করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: *"যে ব্যক্তি শোকের কারণে গালে আঘাত করে, জামার বুক ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলিয়াতের যুগের মতো বিলাপ করে—সে আমাদের দলভুক্ত নয়!"* (সহীহ বুখারী: ১২৯৪)।
📋 আমলের ব্যবহারিক চেকলিস্ট:
- ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়াতে শুধু ১০ই মহররম একটি রোজা না রেখে ৯ ও ১০ই মহররম (অথবা ১০ ও ১১ই মহররম) মোট ২টি রোজা রাখা।
- হযরত মূসা (আ.)-এর বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখা এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা।
- ৬১ হিজরির ১০ই মহররম কারবালার প্রান্তরে হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার প্রেরণা নেওয়া এবং তাঁর জন্য দোয়া করা।
- আশুরাকে কেন্দ্র করে বুক চাপড়ানো, মাতম করা, তাজিয়া মিছিল বা শোকের নামে শরীয়তবিরোধী কাজ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৫. এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মের সুবিধা
আপনার এই আমলকে সহজ ও নিয়মিত করতে এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ফিচারসমূহ। ইসলামিক ক্যালেন্ডার, বিশেষ দিবসের মাসনূন আমল ও সহীহ দোয়া সংকলন সহ আপনি পাচ্ছেন ১১৪টি সূরার শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, অডিও এবং বিষয়ভিত্তিক সার্চ সুবিধা।
👉 বিশেষ সুবিধা: আজকের নামাজ ও সেহরি-ইফতারের সময়সূচি দেখুন →
মোবাইলে বিজ্ঞাপনমুক্ত কুরআন পাঠ ও আমল করুন
১১৪টি সূরার বিশুদ্ধ বাংলা অর্থ, সুললিত অডিও তিলাওয়াত, নামাজের সঠিক সময়সূচী, কিবলা কম্পাস ও ডিজিটাল তাসবিহ সহ সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
Google Play থেকে ইনস্টল করুন
➜
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: আশুরার রোজা কেন ১টির পরিবর্তে ২টি রাখতে হয়?
উত্তর: সহীহ মুসলিমের হাদিসে (১১৩৪) বর্ণিত হয়েছে, ইহুদিরা কেবল ১০ই মহররম একটি রোজা রাখত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের বিরোধিতা করার জন্য নির্দেশ দিলেন: 'আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি ৯ তারিখেও রোজা রাখব।' তাই সুন্নত হলো মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ মোট ২টি রোজা রাখা। কেউ যদি একান্তই ২টি না পারে তবে শুধু ১০ তারিখ রোজা রাখলেও গুনাহ মাফের সওয়াব পাবে, তবে সুন্নতের খেলাফ হবে।
প্রশ্ন: আশুরার রোজার শুরু কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: সহীহ বুখারীর হাদিস (২০০৪) অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় হিজরত করে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল: 'এটি একটি মহান দিন, এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে নাজাত দিয়েছেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছেন; তাই শুকরিয়াস্বরূপ মূসা (আ.) এ দিন রোজা রেখেছেন।' তখন নবীজি ﷺ বললেন: 'মূসা (আ.)-এর সাথে সম্পর্ক ও অধিকারের দিক থেকে তোমাদের চেয়ে আমরাই অধিক হকদার!' অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।
প্রশ্ন: আশুরার দিনে কি সুরমা লাগানো বা গোসল করার বিশেষ ফজিলত আছে?
উত্তর: আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগালে এক বছর চোখ ব্যথা হবে না বা বিশেষ গোসল করলে রোগ হবে না—এ জাতীয় প্রচলিত কথাগুলো হাদিস বিশারদদের মতে জাল ও বানোয়াট। তবে আশুরার দিন পরিবারের খাবারে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুটা প্রশস্ততা (উত্তম খাবার) করার হাদিসটিকে ইমাম বায়হাকী ও ইবনে তাইমিয়াসহ কতিপয় আলেম গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল